যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৬’ প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে ইন্টারনেট স্বাধীনতার উন্নতি উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে দেশের ডিজিটাল নেটওয়ার্কে সেন্সরশিপের হার কমে গিয়ে আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমের প্রবেশাধিকার ও তথ্যপ্রাপ্তির স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যবসা, শিক্ষা ও নাগরিক অংশগ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগের সঙ্কেতও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে সংবাদ সংস্থার ওপর অব্যাহত চাপ ও স্ব-সেন্সরশিপের ঝুঁকি উল্লেখ করা হয়েছে। এই দ্বৈত ফলাফল দেশের নীতি নির্ধারক ও নাগরিক সমাজের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট স্বাধীনতার পথচলা দীর্ঘ ও জটিল। ২০১৮ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন প্রণয়নের পর থেকে অনলাইন প্রকাশনা ও সামাজিক যোগাযোগে সরকারী হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পেয়েছিল। পূর্ববর্তী ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট’ প্রতিবেদনগুলোতে দেশের র‍্যাঙ্কিং নিম্নমুখী ছিল, যেখানে ব্লক করা ওয়েবসাইটের সংখ্যা, আইনি হুমকি এবং সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাইবার অপরাধ মোকাবিলার জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য ন্যায়িক প্রক্রিয়ার সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় কাজের ফলে সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। এই পটভূমি বর্তমান উন্নতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইন্টারনেট স্বাধীনতা বিষয়ে উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য নীতি সমন্বয় করা হয়েছে।’ বিরোধী দল ও এনজিওগুলো তবু সতর্কতা প্রকাশ করে, তারা দাবি করে যে গণমাধ্যমের ওপর অব্যাহত চাপ ও স্ব-সেন্সরশিপের প্রবণতা এখনও বিদ্যমান এবং তা মুক্ত মত প্রকাশের পরিবেশকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। সাংবাদিক সমিতি প্রধানের মতে, ‘প্রতিবেদনটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরলেও, বাস্তবিকভাবে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে।’ সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া মিশ্র; তরুণ ব্যবহারকারীরা উন্নত ইন্টারনেট পরিবেশকে স্বাগত জানায়, আর কিছু নাগরিক এখনও অনলাইন তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও পক্ষপাতিত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে কয়েকটি মূল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রথমত, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের কিছু বিধান সংশোধন করে প্রকাশ্য স্বার্থের জন্য অতিরিক্ত শাস্তি হ্রাস করা হয়েছে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষার জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের পর্যবেক্ষণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে অনলাইন কন্টেন্টের স্বচ্ছতা ও ন্যায়িকতা নিশ্চিত করা হবে। তদুপরি, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে সেন্সরশিপের ঝুঁকি কমে। এই উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করে বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করেন যে, পরবর্তী ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আরও সমন্বিত অবস্থানে পৌঁছাবে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার হবে।