প্রধানমন্ত্রীর শ্রী হাবিবুর রহমানের ২০২৪ সালের মার্চ মাসে জাপান সফর দেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল জাপানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য‑বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন স্তরে উন্নীত করা এবং অবকাঠামো, জ্বালানি, পানি, পরিবহন সংযোগসহ বহু ক্ষেত্রের সমন্বিত প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন করা। টোকিওতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রীসহ শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেন, যেখানে বাংলাদেশে প্রস্তুত জমি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি ব্যবস্থা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এই সফরকে দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও শিল্পায়নের ত্বরান্বিত করার একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও জাপানের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ভিত্তি ১৯৭২ সালের স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্ব চুক্তি থেকে শুরু হয়, এবং এরপর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারী হিসেবে স্বীকৃত। তবে গত দশকে দেশের শিল্পায়ন ও নগরায়নের দ্রুত গতি সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো ঘাটতি, বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং লজিস্টিক্সের অপ্রতুলতা প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানি ভিত্তিক শিল্পখাতে জাপানি প্রযুক্তি ও মূলধনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, যেখানে জাপানের উচ্চমানের যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইন এবং গবেষণা‑উন্নয়ন সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অতএব, প্রস্তুত জমি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে বিনিয়োগের পরিবেশকে উন্নত করা, জাপানীয় সংস্থাগুলোর জন্য ঝুঁকি হ্রাসের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ত্বরান্বিত করার মূল চাবিকাঠি।

সফরে শ্রী হাবিবুর রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের বর্তমান অবকাঠামো চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশদভাবে জানিয়ে দেন এবং জাপানকে সরাসরি বিনিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট প্রকল্পের তালিকা উপস্থাপন করেন। জাপানের অর্থ মন্ত্রী শ্রী হিদেকি তানাকা উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের প্রস্তুত জমি ও অনুমোদন ব্যবস্থা যদি স্বচ্ছ ও দ্রুত হয়, তবে জাপানীয় কোম্পানিগুলো দ্রুতই প্রকল্পে অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করবে।” জাপানি ব্যবসা সমিতির সভাপতি শ্রী তসুয়ো ইশিকাওয়া যোগ করেন, “আমরা জাপানীয় প্রযুক্তি ও মূলধনকে বাংলাদেশে স্থাপন করে উভয় দেশের পারস্পরিক লাভ বাড়াতে আগ্রহী।” দেশের শিল্প সমিতি ও সাধারণ জনগণও এই সম্ভাব্য বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও রপ্তানি ক্ষমতা বাড়ার আশায় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর সরকার ত্বরিতভাবে বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে একত্রে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রস্তুত জমির তালিকা, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের পরিকল্পনা, এবং পরিবহন সংযোগের রূপরেখা এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জাপানি সংস্থাগুলোর কাছে উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া, বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) নীতিমালার পুনর্বিবেচনা করে কর সুবিধা ও ভূমি অধিগ্রহণের স্বচ্ছতা বাড়ানো হবে। বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি এই পদক্ষেপগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী পাঁচ বছর মধ্যে জাপান থেকে বাংলাদেশে প্রায় দুইশত কোটি ডলারের অতিরিক্ত বিনিয়োগ আসতে পারে, যা শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থান ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাবে।