রাজধানীর উত্তর‑পশ্চিমে অবস্থিত গৌরবপুর বন্যপ্রাণী সংরক্ষিত বনভূমি সম্প্রতি সরকারী পরিকল্পনা অনুসারে একটি আধুনিক বিনোদন পার্কে রূপান্তরিত করার প্রস্তাব পেশ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১,২০০ একর জমিতে রোলার কোস্টার, থিম পার্ক এবং হোটেল নির্মাণের মাধ্যমে পর্যটন আয় বৃদ্ধি করা হবে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে সংরক্ষিত বনভূমি কোনো সাধারণ সরকারি জমি নয়; এটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল এবং দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির অধীনে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ সমিতি, বিজ্ঞানী এবং সাধারণ নাগরিকের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে।
গৌরবপুর বনভূমি ১৯৯২ সালে জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত হয় এবং তাতে ১২০টি বিরল গাছের প্রজাতি ও ৩৫টি বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাসস্থান রয়েছে। পূর্বে একই ধরনের প্রকল্পে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি সংরক্ষিত জঙ্গলে অবৈধ কাঠ কাটার মাধ্যমে পরিবেশগত ক্ষতি ঘটার উদাহরণ রয়েছে, যা পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে রোধ করা হয়েছিল। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পূর্ববর্তী নীতি ছিল সংরক্ষিত এলাকায় কোনো বাণিজ্যিক উন্নয়ন অনুমোদন না করা, তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের মুখে সরকার বিকল্প আয় উত্স খুঁজতে এই ধরনের উদ্যোগের দিকে ঝুঁকেছে বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব শ্রীমতি রেহানা ঘোষণার পর তৎক্ষণাৎ একটি ব্যাখ্যামূলক বিবৃতি জারি করে বলেন, সংরক্ষিত বনভূমিতে পর্যটন সুবিধা যুক্ত করলে স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। তবে গৌরবপুর পরিবেশ সংরক্ষণ সমিতির সভাপতি ড. অমিতাভ চৌধুরী উল্লেখ করেন, এই ধরনের প্রকল্পে প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংসের ঝুঁকি অপরিসীম এবং বৈজ্ঞানিক পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়া কোনো অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়ই সরকারকে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন মেনে চলতে আহ্বান জানিয়ে পার্কের পরিকল্পনা স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সামাজিক মিডিয়ায় এবং সরাসরি প্রতিবাদে প্রকাশ করেছেন, তারা বনের শিকড় রক্ষা করতে চায় এবং বিকল্প উন্নয়ন মডেল প্রস্তাব করছেন।
সরকার বর্তমানে গৌরবপুর প্রকল্পের জন্য একটি বহুবিভাগীয় কমিটি গঠন করেছে, যার মধ্যে পরিবেশ বিজ্ঞানী, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই কমিটি আগামী দুই মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জমা দেবে এবং ফলাফলের ভিত্তিতে পার্কের অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। পাশাপাশি, উচ্চ আদালতে পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থাগুলি ইতিমধ্যে মামলায় দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা প্রকল্পের আইনি বৈধতা পরীক্ষা করবে। বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি প্রকল্পটি পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ না করে তবে সরকারকে বিকল্প উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, নতুবা আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থার কাছ থেকে সমালোচনা ও আর্থিক শাস্তি আরোপিত হতে পারে।