বাংলাদেশে চলমান ডেঙ্গু মহামারির প্রেক্ষাপটে একটি হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি চোখে পড়ছে, যেখানে নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জৈবিক দিক থেকে নারীদের ফুসফুস পুরুষদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত মজবুত হওয়া সত্ত্বেও তারা এই রোগে বেশি মৃত্যুবরণ করছেন। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা পরিবারের অভ্যন্তরে মেয়েশিশু ও নারীদের প্রতি প্রদর্শিত সামাজিক অবহেলা এবং কম গুরুত্বকে দায়ী করছেন। ফলে, নারীদের রোগের লক্ষণ দেখা দিলেও তাদের সময়মতো চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয় না, বরং একেবারে শেষ মুহূর্তে, যখন রোগী অসহায় অবস্থায় পৌঁছায়, তখনই তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনার নেপথ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধাগুলো রয়েছে। বাংলাদেশের অনেক পরিবারে এখনো মেয়েদের প্রতি পুরুষদের তুলনায় কম মূল্য দেওয়া হয়, যা স্বাস্থ্যসেবায়ও প্রতিফলিত হয়। ডেঙ্গু রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো, যেমন জ্বর, শরীরব্যথা এবং মাথাব্যথা, অনেক সময় সাধারণ জ্বরের সাথে মিলে যায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো দেখা দিলেই পরিবার দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা নারীদের রোগের গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হন এবং তাদেরকে ঘরে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে সময় নষ্ট করেন। এই দেরিই নারীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় এবং রোগটি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নারী রোগীদের বেশিরভাগই এমন অবস্থায় আসেন, যখন তাদের রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং রক্তস্রাবের ঝুঁকি তীব্র হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, যদি প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই নারীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হতো, তবে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি হতো। জনজীবনে এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, কারণ এটি দেখায় যে স্বাস্থ্যসেবায় লিঙ্গভেদ এখনো একটি বড় বাধা। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতিক্রিয়াও এই অবহেলার প্রতিফলন, যারা নারীদের রোগের গুরুত্ব উপেক্ষা করে তাদেরকে দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য প্রার্থনা করেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন না।
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই জটিল সমস্যার সমাধানের জন্য বর্তমানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগগুলো নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রচারণা শুরু করেছে। হাসপাতালগুলোতে নারী রোগীদের জন্য আলাদা বিভাগ এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তারা সময়মতো সেবা পেতে পারেন। ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপটে, সামাজিক মতাদর্শ পরিবর্তন এবং লিঙ্গসমতা বিষয়ে সচেতনতা জাগ্রত করার মাধ্যমে এই মৃত্যুহার কমানোর লক্ষ্যে কাজ করা হবে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে নারীদের স্বাস্থ্যের প্রতি সমান গুরুত্ব দিতে হবে এবং যেকোনো রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগে নারীদের মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হবে।