সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি টন খাবার অপচয় হচ্ছে, যা মোট উৎপাদিত খাবারের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। এই পরিমাণের অপচয় কেবলমাত্র খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির কারণ নয়, বরং অর্থনৈতিক ক্ষতি ও পরিবেশগত প্রভাবের দিক থেকেও তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে নগরাঞ্চলে বাড়ির খাবার বর্জ্য, রেস্তোরাঁ ও হোটেলের অতিরিক্ত উৎপাদন এবং কৃষি উৎপাদনের পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতির অভাব এই সমস্যাকে তীব্রতর করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ও সমাজের সকল স্তরে তৎপরতা প্রয়োজন, যাতে খাবারের অপচয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।

খাবারের অপচয়ের পেছনে বহুস্তরীয় কারণ রয়েছে। প্রথমত, গৃহস্থালী পর্যায়ে অতিরিক্ত রান্না, খাবার সংরক্ষণে অপ্রতুল জ্ঞান এবং খাবারকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফেলে দেওয়া প্রধান কারণ। দ্বিতীয়ত, কৃষি উৎপাদন শৃঙ্খলে অবিকশিত সরবরাহ শৃঙ্খল, অপর্যাপ্ত শীতলীকরণ সুবিধা এবং বাজারে অনিয়মিত মূল্য নির্ধারণের ফলে উৎপাদক ও ভোক্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। তৃতীয়ত, রেস্তোরাঁ ও হোটেল শিল্পে অর্ডার পূর্বাভাসের ভুল, অতিরিক্ত মেনু বিকল্প এবং খাবার বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় বড় পরিমাণে খাবার নষ্ট হয়। এসব কারণ সমন্বিতভাবে খাবারের অপচয়ের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে।

বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই সমস্যার সমাধানে ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ড. রশিদ হক উল্লেখ করেন, “খাবার সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা অপরিহার্য।” পাশাপাশি, পরিবেশ সংরক্ষণে সক্রিয় এনজিও ‘সবুজ বাংলাদেশ’ এর সভাপতি শ্রীমতি নূরজাহান বলেন, “খাবারের বর্জ্য কমাতে ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রেস্তোরাঁগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অনুসরণ করতে বাধ্য করা জরুরি।” সাধারণ জনগণের মধ্যেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে; সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে বহু পরিবার তাদের খাবার সংরক্ষণ পদ্ধতি শেয়ার করে অন্যদের উদাহরণ স্থাপন করছে।

সরকার ইতিমধ্যে খাবারের অপচয় কমাতে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ‘খাবার নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ’ প্রকল্পের অধীনে কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের শীতলীকরণ ইউনিট সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ কর্মশালা চালু করেছে। এছাড়া, খাদ্য ও প্যাকেজিং মন্ত্রণালয় রেস্তোরাঁ ও হোটেল শিল্পে ‘খাবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করে বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। ভবিষ্যতে, জাতীয় পর্যায়ে ‘খাবার বর্জ্য হ্রাস আইন’ গৃহীত হলে, অপচয় রোধে আইনি শাস্তি ও প্রণোদনা ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে আশা করা যায়। এসব পদক্ষেপের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন ও জনসচেতনের উন্নয়নই খাবারের অপচয় কমিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হবে।